আচ্ছা কেমন হত যদি আমরা বোবা হতাম? কেমন হত যদি শত চেষ্টা করার পরেও আমাদের মুখ থেকে শব্দ না বের হত? আমাদের হাজার চেষ্টার পরেও আমরা প্রকাশ করতে পারতাম না আমাদের অনুভূতি! শুধু একবার চোখ বন্ধ করে ভাবলেই থেমে যাবে আমাদের হাতে থাকা কাজ। এটাও কি সম্ভব? হ্যাঁ, ঠিক এমনই অনুভূতি হয় বোবা মানুষগুলোর। তাদের জন্য ভীষণ মায়া হয়।
চলুন তাহলে শুরু করি কিছু শুরুর গল্প থেকে, ভাষা আন্দোলনের।
৩ জুন ১৯৪৭। তৎকালীন উপমহাদেশের শাসক বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে মাউন্টব্যাটেন বিভক্ত হতে যাওয়া ভারত-পাকিস্তানের হাতে ক্ষমতা প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগের ঘোষণা দেয়। এর প্রায় ১ মাস পর, ২৭ জুলাই, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিনের বিবৃতি আসে যে ‘উর্দুই হবে নয়া পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। ঠিক তার পরের দিন, ড. জিয়াউদ্দিনের বিবৃতির প্রতিবাদে দৈনিক আজাদ-এ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা শীর্ষক’ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। কয়েকদিন এভাবেই চলার পর, ১৪ই আগষ্ট
সাম্প্রদায়িকতাজাত পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয় এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানের প্রথম গর্ভনর জেনারেল ঘোষণা করা হয়। নতুন দেশ পেয়ে কারও মন ভালো ছিল। ভিটে হারানোর যন্ত্রণাও ছিল অনেকের। দেশ ভাগ অনেকের ভাগ্যও পরিবর্তন করে দিয়েছিল।
১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭। পাকিস্তানের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ৩১টি বিষয়ে সার্কুলার প্রকাশিত হয়। ভাষা সম্পর্কীয় ৯টি বিষয়ের মধ্যে উর্দু, হিন্দি, ইংরেজী, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ল্যাটিন, সংস্কৃত থাকলেও বাংলা ভাষার উল্লেখ ছিলনা কোথাও। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সব জায়গায়। ঐ সার্কুলার প্রকাশের পর শিক্ষক, শিল্পী, ডাক্তার, ছাত্র, আইনজীবী এবং আরও কিছু মান্যগণ্য ব্যক্তিদের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশ করা হয় ১৮ই সেপ্টেম্বর। ঐ স্মারকলিপিতে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার জোর দাবী ওঠে। কিন্তু নতুন পাকিস্তান সরকারের এসব নিয়ে যেন কোন মাথা ব্যথাই ছিল না। উপরন্তু, করাচীতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে সরকার। সময় ছিল ২৭শে নভেম্বর।
কিন্তু ৫ ডিসেম্বর, এই শিক্ষা সম্মেলনে গৃহীত বাংলা ভাষা সম্পর্কিত আলোচনার প্রতিবাদে ঢাকায় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় উপস্থিত হয়ে ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা এহেন সিদ্ধান্ত নিয়ে যারপরনাই অখুশি ছিলেন। তার পরের দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে ছাত্রদের প্রতিবাদ সমাবেশে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী এবং পরে বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে এটি ছিল প্রথম সভা ও মিছিল যাতে সবার সমর্থন ছিল। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা সহ বিভিন্ন দাবী-দাওয়া আদায়ের জন্য সচিবালয়ের কর্মচারীরা ধর্মঘট পালন করে এর কয়েক দিন পরেই। আর, ডিসেম্বর’র শেষ সপ্তাহ প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।
আমরা যদি ইতিহাসের পাতার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, ১৯৪৭ সালে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে কোনো মিল না থাকার পরও শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে ১২শ’ মাইল ব্যবধানের দুটি পৃথক ভূখণ্ডকে এক করে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান যা আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। সমগ্র পাকিস্তানের যদি হিসাব করি তাহলে তৎকালীন প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে, শুধু ৭.২ শতাংশ মানুষ কথা বলত উর্দু ভাষায়। এছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তানে অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষাও প্রচলন ছিল। কিন্তু সেই উর্দুকেই পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পাঁয়তারা শুরু করে এবং সেই হিসাবে নকশা বানায়।
কিন্তু বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তা হতে দেয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় দেশভাগের পরপরই কলকাতায় একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পিছিয়ে পড়া, অত্যাচারিত ও নিপীড়িত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কী হয়েছিল তখন?
প্রতিষ্ঠিত ওই সংগঠনের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ওই সময় কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে এসে শেখ মুজিব সরাসরি যুক্ত হন ভাষা আন্দোলনের সাথে। গঠিত হয় তমুদ্দিন মজলিস, এরপর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। যখন বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু হয়, তখন থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বর মাসে ১৪ জন ভাষা বীর সর্বপ্রথম ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার পেশ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ, ফজলুল হক মুসলিম হলের তমুদ্দিন মজলিস এবং মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথসভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, আবুল কাশেম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজিত গুহসহ অন্য নেতৃবৃন্ধ। ওই সভায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত সর্ব সম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই দিন হল এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। কারণ এইদিন ভাষার দাবিতে প্রথম হরতাল পালিত হয়। এটাই হলো নতুন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১ম হরতাল। হরতালের নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু সরকার তা মেনে নেবে কেন? ওইদিন তিনি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, জেলে বন্দী রাখা হয়। এটি ছিল পাকিস্তানে কোনো প্রথম রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার।
তথ্যসূত্রঃ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি, প্রকাশক বাংলা একাডেমি)।
অনেক ইতিহাস আজ টানলাম। এই ইতিহাস আমাদের সবার জানা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন পূর্ণতা পায়। শহীদ হয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক সহ আরও অনেকে। সেই ইতিহাস সবার জানা। তাই আজ আর ওই সব আলোচনায় যাচ্ছি না। আমি শুধু এটাই বলতে চাই যে আমাদের দেশ আসলেই কি বাংলা ভাষার মর্যাদা দিতে পেরেছে? প্রতিষ্ঠা হয়েছে কি বাংলার আসল ব্যবহার। নাকি আজও আমরা ঘুমিয়ে আছি? সেই উত্তাল ২১শের বিকালবেলা কি আবার ফিরে আসবে? আমরা কি আবার বুঝতে পারবো কিসে আমাদের মর্যাদা?
![]() |
| 21st February picture |
![]() |
| 21st February picture |
![]() |
| 21st February picture |
![]() |
| 21st February picture |
































0 মন্তব্যসমূহ