Ticker

6/recent/ticker-posts

স্বপ্নজাল- for the sake of love

স্বপ্নজাল- for the sake of love- Hasan Ibrahim.

হাসপাতালের ২য় তলা। ৭নং রুম।

সুজানার মুখে অক্সিজেন মাস্ক। হাতে সুঁই ফোটানো। বুঝতে পারলো রক্ত দেয়া হচ্ছে ওকে। ঘাড় ব্যথা করছে খুব। বাম পাশে তাকাতে চাইলো। নড়তে পারছে না। খুব ব্যথা। শক্ত হয়ে আছে ঘাড়টা।


আবছা আবছা দেখছে সবকিছুই। তবুও ভাবার চেষ্টা করছে কি হয়েছে। গাড়িটা যে এভাবে ওদের মোটরসাইকেলের উপর উঠে যাবে ভাবেইনি কেউ।আর ভাবতে পারে না সুজানা। ঘাড়টা চিনচিন করে ব্যথা করছে। অনুজকে খুঁজে বেড়াতে লাগলো। অনুজ যে কই গেছে... আচ্ছা ওর কতটা কেটে গেছে? বেশি ব্যথা পেয়েছে? যতদূর মনে পড়ছে আঘাত পাওয়ার আগে ও...

ঠিক ওই সময় অনুজ ঢুকলো। চোখ ফোলা, নিশ্চয়ই কান্না করেছে অনেক। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সুজানা।

-তোমার কোথাও লাগেনি তো অনুজ?

-না।

-আমার পুরো মাথা আর ঘাড় কেমন যেন শক্ত হয়ে আছে, নড়তে পারছি না। একটু হেল্প করবে?

উঠার চেষ্টা করে সুজানা। ব্যস্ত হয়ে ওঠে অনুজ।

-থাক, থাক। নড়াচড়া করো না। একটু আগেও এমন ছটফট করছিলে তুমি, তাই ডাক্তার ডাকার জন্য বাইরে গেছিলাম।

-আচ্ছা অনুজ, যদি আমি মারা যেতাম?

-আর আমি মরে গেলে কি হতো?

-উফফ..তুমিও না.... তুমি জানো যে আমার এসব একদম ভালো লাগে না। তুমি মরে গেলে আমাদের স্বপ্ন কিভাবে পূরণ হতো?

-স্বপ্ন একা পূরণ হয় না সুজানা। আমি আর তুমি মিলে আমাদের হয়। স্বপ্ন এক সাথে দেখেছি, একসাথেই পূরণ করেছি যা পেরেছি।

সুজানা আবারো উঠে বসার চেষ্টা করলো, পারলো না। এগিয়ে এলো অনুজ। পাশে বসলো। কান্না চোখে তাকালো সুজানা।

-খুব কষ্ট হচ্ছে অনুজ।

-আর একটু অপেক্ষা করো। ডাক্তার এলো এই যে। আমি বাইরে আছি। ভাল হয়ে বাড়িতে এসো।


সুজানা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কি যা তা বলছে অনুজ! কিছু বলার আগেই রুমে ঢুকলো ডাক্তার আর নার্সরা। পাশ কাটিয়ে গেল ডাক্তারকে। বাইরে চলে গেলো। ফিরেও তাকালো না। অনেক অভিমান জমলো ওর উপর সুজানার। আর কথা বলবে না ও। হুহ...দেখি কিভাবে রাগ ভাঙায়...

প্রচণ্ড ঝাকুনিতে সুজানা যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। ডাক্তার আর নার্সরা এতো অবাক আর চিল্লাচিল্লি কেন করছে কে জানে? কিছু একটা ঘাড় থেকে সরিয়ে নিলো ডাক্তার। এবার কিছুটা ঘাড় নাড়াতে পারছে। একজন ডাক্তার এসে চোখে আলো ফেলে কি যেন চেক করছে। কিছুটা হুঁশ ফিরলো যেন ওর। স্পষ্ট শুনতে পেল এবার কথাগুলো।


“.......আপনারা এত লোক থাকতে এই ঘটনা কিভাবে হলো? আমি অথারিটিকে কি জবাব দেবো? কে নেবে এর দায়? কেউ যদি এটা বাইরে প্রকাশ করে তাহলে হাসপাতালের বদনাম হবে.....”

সুজানা বুঝতে পারলো না কার কথা বলছে সবাই। কেনই বা এতো রেগে গেল ডাক্তার। যাই হোক ওর ঘাড় ঘুরাতে হবে। নার্সকে ইশারায় কাছে ডেকে বুঝালো ওটা।

-ম্যাডাম, আমরা লাশটা সরিয়ে নিয়েই আপনাকে একপাশ করে ঘুরিয়ে দেবো।

-মানে?

-আপনি কিছুই জানেন না?

-না।

-একটু স্বাভাবিক হউন ম্যাম। নিজেকে একটু সামলান।

-আমায় বলবেন প্লিজ কি হয়েছে? আমি ঠিক আছি। বলুন আমায়।

-আপনার সাথে যিনি ছিলেন তিনি আপনার পাশেই মারা গেছেন। উনাকে অন্য ওয়ার্ডে রেখে ট্রিটমেন্ট করা হচ্ছিলো। প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন। কিছুই বলতে পারছিলেন না। শুধু আমাদের ইশারায় কি বোঝাতে চাইছিলেন বারবার। উনাকে চিকিৎসা দিয়ে আমরা অন্য হাসপাতালে ফোন করছিলাম যেহেতু উনার অবস্থা ক্রিটিকাল ছিল। কোন ফাঁকে যে উনি আপনার পাশে এসে বসেছিলেন আমরা টের পাইনি। আপনার মাথায় হাত বুলিয়েই যাচ্ছিলেন মনে হয় উনি....আমরা ওভাবেই পেলাম উনাকে।


আর কিছু কানে যাচ্ছে না সুজানার। শরীরের সব শক্তি দিয়ে ঘাড় ঘুরালো সুজানা। দুজন ওয়ার্ড বয় টেনে নিয়ে যাচ্ছে অনুজের বডি। স্ট্রেচারে রাখলো ওকে। মাথাটা একপাশ করা। তাকিয়ে আছে। চোখগুলো স্থির। হাতটা  ঝুলছিল, ওরা গুছিয়ে নিলো। নিয়ে চললো অন্য রুমে।কথা বলতে যেও আর কথা বলতে পারছে না সুজানা।ডাক্তাররা ওর মুখে আবার অক্সিজেন মাস্কটা লাগিয়ে দিলো। চোখ থেকে কান্না গড়িয়ে পড়লো। কিছু বলার জন্য মুখ খুলেও কিছুই বলতে পারলো না। বুঝতে পারলো হুঁশ হারিয়ে ফেলছে সে। এক গভীর কালো আবছা কিছু যেন তার চোখ ঢেকে দিচ্ছে।


পুকুরপাড়। সাদা মেঘ আকাশে। গালে হাত দিয়ে বসে আছে অনুজ। ভালো আছে সুজানা এখন। প্রপার ট্রিটমেন্ট পেয়েছে। সত্যিই কত যে স্বপ্ন ছিল ওদের....একা পারবে ও?

পিঠে একটা কিসের আঘাত লাগলো অনুজের। পেছন ফেরার সাথে সাথেই একগাদা কিল আর থাপ্পড় পড়লো পিঠ আর মাথায়।

-কিন্তু তুমি তো....

-কোন কথা বলবা না তুমি। তোমার সাহস হয় কি করে আমায় ছেড়ে আসার?

-তুমি বাঁচার কথা। সব তো ঠিক ছিল। রিকভার পসিবল ছিল। তাহলে?

আরেকটা পিঠে কিল দিলো সুজানা। তারপর অনুজের হাতটা টেনে নিয়ে নিজের হৃৎপিণ্ডের উপর রাখলো।

-থেমে গেছিলো জানো? আর চলেনি। তুমি এতো ভালোবেসে গেছো সারাজীবন। এমনকি দূরে থাকতে চাওনি যখন তুমি নিজে এতো আহত ছিলে....মাথায় হাত রেখে আদরে রেখেছিলে তুমি। অথচ নিজের জীবন শেষ করেছিলে কেন?

চোখের পানি মুছিয়ে বুকে টেনে নিলো সুজানাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

-তোমার কিছু হলে আমি ঠিক থাকি না। তুমি তো জানোই। তুমি ভয় পেয়ে যাও হঠাৎ কিছু হলে। এতো রক্ত, ওষুধ, ডাক্তার, নার্স দেখে ঘাবড়ে যেতে। আমি তাই সব ফেলে তোমার কাছে যাই। গিয়ে দেখি তুমি বেহুঁশ। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। কখন যে আমার টিকিট কাটা হয়ে গেলো....

সুজানা আঁকড়ে ধরলো ওকে। অঝোরে কান্না করছে।

-আমার আত্মা যখন তোমায় কষ্ট পেতে দেখলো...ডাক দিলাম ডাক্তারকে। অথচ কেউ শুনতে পাচ্ছিলো না। আবার ফিরে এলাম তোমার কাছে। দেখি তাকিয়ে আছো আমার দিকে। আর আমি....

মুখে হাত রেখে থামিয়ে দিল সুজানা। বুকে মাথা ঘষে জিজ্ঞেস করলো,"কেন এতো ভালোবাসো আমায়?"

হাসি ফুটে উঠলো এবার অনুজের মুখে। বুকে নিয়ে হাতে হাত রেখে আছে ওরা।

-আমি কথা দিয়েছিলাম যে তোমার হাত ধরে বুড়ো হবো। তাহলে ভাবো তুমি কতোটা স্পেশাল আমার জীবনে।

-তাই তো নিজেকে দূরে রাখতে পারিনি। পারবোও না।

দুজনে আরাম করে গল্প করছে। অভিমান নেই আর। অনেক দূরে দুটো নতুন কবর খুঁড়ছে লোকজন। পাশাপাশি দুজন ঘুমাবে। আজীবন। রোজ কেয়ামত পর্যন্ত।


Story: Hasan Ibrahim

Copying without permission is strictly prohibited.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ