Ticker

6/recent/ticker-posts

সহযাত্রী- Following Every Step

সহযাত্রী- Following Every Step

বাইরে ঝুম বৃষ্টি নামলো। আষাঢ় মাসের বৃষ্টি কখনো বলে কয়ে আসে না। এই রোদ উঠে ছিল একটু আগেও। এখন আকাশ গাঢ় অন্ধকার। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।একগাদা কাপড় নিয়ে হুড়মুড় করে ঘরে ডুকলো রাহী। নিজের শরীরের দিকে তার খেয়াল নেই। অর্ধেক ভিজে গেছে। কাপড়গুলো ঘরে রেখে আবারও বাইরে গেল ও।



নীলা ঘরে শুয়ে আছে চুপচাপ। ফিরেও তাকালো না রাহীর দিকে। একটু পর রাহী আবার ফিরে এলো। হাতে একটা পেয়ারা। টেবিলের ওপর রেখে পাশের রুমে গেল। কাপড় পাল্টে এলো। পেয়ারা হাতে নিয়ে ছুরি দিয়ে কাটলো। চার ভাগ করে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলো নিজের হাতের তালুতে। নীলার দিকে হাতটা উঁচু করে বললো, “খাও।”

নীলা অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। রাহী আরেকটু কাছে হাতটা নিয়ে বললো, “খাও না, অনেক মিষ্টি।‘’

নীলা তবুও খেলো না। রাহী হাত নিচু করতেই হাত থেকে একটা টুকরো নীলা তুলে নিলো। হাসি ফুটে উঠলো রাহীর মুখে।

-তুমি সবগুলো খাও। আমি রান্নাটা করে আসি। কাল না হয় তরকারিতে ঝাল কম হয়েছিল। আজ কিন্তু হবে না।

রাহী উঠার জন্য তৈরি হতেই নীলা তার হাত চেপে ধরে। অন্যদিকে মুখ করে আছে সে।

-কিছু বলবে নীলা?

-আমি আমার জবাব পাইনি এখনো। ৭ দিনের সময়টা কালকেই শেষ হয়েছে। উত্তরটা দিয়ে যাও।

-আমার উত্তর তুমি জানো নীলা।

চোয়াল শক্ত করে জবাব দেয় রাহী। হাতটা ছেড়ে দেয় নীলা। চুপ করে একপাশ ফিরে শুয়ে থাকে। জানালা দিয়ে বাইরে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। অনেক বৃষ্টি হচ্ছে।
২ বছর আগে এমনই একদিনে নীলাকে বিয়ে করেছিল রাহী। ভালবেসে বিয়ে। সংসার সাজিয়ে নিতেই বেশি মনোযোগী ছিল নীলা। দুজনে মিলে খুব ভালবেসে গড়ে তুলেছিলো এই ঘর। চাকরি করতো দুজনেই একই কোম্পানিতে। একসাথে যাওয়া আসা করতো। নীলা ওর চেয়ে সিনিয়র পোষ্টে ছিল। কিন্তু ওসব নিয়ে রাহীর কোন মাথা ব্যথা ছিল না। ও চাকরিকে চাকরি আর ঘরকে ঘরের জায়গায় রাখতেই পছন্দ করতো। নীলাই বরং রাগ দেখাতো রাহীর সাথে।

-ম্যাডাম, আপনার সাইন লাগবে এই ফাইলে।

-উফফফ… তুমি আবার আমায় ম্যাডাম ডাকলে? আচ্ছা, বউ ডাকতে না পারো কিন্তু নীলা তো ডাকতেই পারো নাকি?

-ম্যাডাম, আমি চাই না আমার দেখাদেখি অন্য কলিগরাও আপনাকে নাম ধরে ডাকুক।

-ওহহো, তো জনাবের হিংসাও হয়?

-যা মনে করেন। আপাতত সাইনটা দিন।

-ওকে, কিন্তু রাহী সাহেব…।

-জি ম্যাডাম জানি, প্রতিদিনের অর্ডার। আজ আমার ডেস্কে কোন ফাইল জমা নেই। তাই আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আজ আপনারও ছুটি।

চলে যায় রাহী। তাকিয়ে থাকে নীলা। রোজ ওর টেবিলে একগাদা ফাইল থাকে। তার কিছু নীলা আনিয়ে নিজেই সেগুলো চেক করে। যাতে ওর চাপটা কমে। ফেরার সময় দুজন একসাথেই বাড়ি ফেরে। রাহী অফিস আওয়ার শেষ হওয়ার সাথে সাথেই স্বরূপে ফিরে আসে। সবার সামনেই নীলার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে হাত ধরে লিফটের কাছে নিয়ে যায়। লিফটেও সে এমনভাবে দাঁড়ায় নীলার সামনে যাতে কেউ তার শরীরের সাথে না লাগতে পারে। ব্যপারটা নীলার কাছে বেশ ভাল লাগে।

নীলার কাশি ওঠে। চমক ভাঙ্গে রাহীর। দৌড়ে গিয়ে পানি এগিয়ে দেয় নীলার দিকে। পাশে বসে পানি খাইয়ে দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ আঁকড়ে থাকে নীলা। মুষড়ে পড়েছে মেয়েটা। রাহী কপালে নিজের গালটা রাখলো। এটা নীলার খুব পছন্দ।

-আমার কথা মেনে নাও রাহী। জীবনে কিছুই চাইনি তোমার কাছে। আমার প্রথম আর একমাত্র চাওয়াটাও কি পূরণ করবে না?

-কখনোই না।

চলে যায় রাহী রান্নাঘরে। তরকারি মনে হয় পুড়ে গেছে কিছুটা। পুড়ে তো অনেক কিছুই যায়। যেমন ওদের সাজানো সংসারটা।
১ বছর আগে। বিকাল ৬টা।
ঈদের আগে অফিসে ঝামেলা অনেক হয়। ওভার টাইম করতে হয় দুজনকেই। তবুও ক্লান্তি নেই। একসাথেই তো আছে।

-রাহী সাহেব, আপনার কাজ কি শেষ?

-জি ম্যাডাম।

-ওই! অফিস আওয়ার শেষ। এখন নাম ধরে ডাকতেই পারো। আচ্ছা শোনোনা, আজ ১ম রোজা। আর দেখো ইফতার বাইরে করতে হবে।

-তাতে কি? একসাথেই খাবো। তারপর আপনার কাছ থেকে স্পেশাল....

-ফাজিল।

লিফটে ওঠে ওরা। আজও ওভাবেই দাঁড়ালো রাহী। নীলা তাকিয়ে আছে রাহীর দিকে। আজ বাসায় গিয়ে ওকে বলবে, রাহী সাহেব আপনি বাবা হতে চলেছেন। ভেবে নিজেই মুচকি হাসে নীলা। কাঁধে মাথা রাখে ওর। কেমন জানি একটা জোরে দুলুনি খেল লিফটটা।

হাসপাতালে যখন নীলার হুঁশ ফিরলো, তখন রাহী ওর হাত ধরে বসে ছিল। পুরো শরীরে ব্যথা ওর। রাহী খুঁড়িয়ে হাঁটছে। বাম পা পুরোটা ব্যান্ডেজ ওর। একটু এগিয়ে ক্রাচগুলো নিলো ও। ডাক্তারের সাথে কথা বলছে। কাকুতি মিনতি করছে। নীলার একদম সহ্য হলো না। উঠতে গিয়েও মাথা ঘুরে পড়ে যেতে লাগলো। নার্স আর রাহী এগিয়ে এলো।

-তোমার…তোমার পায়ে কি হয়েছে? ব্যান্ডেজ কেন?

-পা ভেঙ্গে গেছে নীলা। ও কিছু না ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ব্যস্ত হইয়ো না।

-ডাক্তার ডাকো, আমি কথা বলবো।

-নীলা, প্লিজ থামো।

নীলা স্থিরভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। একবার নিজের দিকে, একবার রাহীর দিকে। প্রায় চিৎকার দিয়েই রাহীর নাম নিয়ে নীলা অজ্ঞান হয়। ওর পা কেটে আলাদা করে বের করা হয়েছিল ক্যাবল ছেঁড়া ওই লিফটের তলা থেকে, না হয় বাঁচানোর কোন উপায় ছিল না।

বাইরে ঝুম বৃষ্টি থামেনি এখনো। নীলার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো। দেখতে পাচ্ছে রাহীকে। রান্না করছে। পাশের হুইল চেয়ারটা টেনে নেয় নীলা। অনেক কষ্টে নিজের শরীরকে টেনে তুলতে চায় সে। রোজ রাহী তাকে সাহায্য করে। আজ সে নিজে চেষ্টা করবে। কান্নায় বুক ভেসে যাচ্ছে ওর। পারছে না কোন ভাবেই। কাঁধে রাহীর হাত অনুভব করলো ও। ওকে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো নীলা।

-আমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছো না কেন তুমি? কেন নিজের লাইফটা সাজাচ্ছো না? চাইলেই তুমি আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করতেই পারো। আমার মত মেয়ে যার দু পা নেই, যে আর কোনদিন মা হতে পারবে না, তার সাথে থেকে কেন নিজের লাইফ নষ্ট করছো? কেন মুক্ত করছো না আমায়? আমার শেষ চাওয়া প্লিজ পূরণ করো, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ......।

রাহী কিছুই বলে না। বুকে আঁকড়ে ওকে শুইয়ে দেয়। নীলা কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে।পরেরদিন দেরিতে ঘুম ভাঙল নীলার। রাহী নেই পাশে। পাশের বাড়ীর খালা সামনে।

-কখন এলে খালা? কেমন আছো?

-ভাল আছি রে মা।

-ও কই খালা?

-ওই তো আমায় সকাল বেলায় এখানে আসতে বললো। কি একটা কাজে যাচ্ছে বললো। ফিরতে নাকি ২ দিন লাগবে।

অবাক হল নীলা। রাহী কখনো এমন করেনি। ফোন বের করে কল করতেই দেখলো মোবাইল বালিশের নিচে রেখে গেছে। কিছুই বুঝতে পারলো না নীলা। তবে কি রাহী ওকে ছেড়েই চলে গেল?

৪ দিন পর।

হাসপাতালের বেডে রাহী। ওর কিছু পুরানো বন্ধু ওর পাশে। বাইরে আরও কিছু মানুষ। একটু পর হুইল চেয়ারে করে নীলাকে নিয়ে ঢুকলো খালা। রাহীকে এই অবস্থায় দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো নীলা। বারবার শুধু চিৎকার করে একটা কথাই জানতে চাইলো কেন এমন করলো ও।
নীলাকে কাছে টেনে নিল রাহী। ডাক্তার এগিয়ে আসতে চাইলেও ইশারায় নিষেধ করলো রাহী।

-কেন করলে এমন? কেন এতো বড় শাস্তি দিলে আমায়? কেন, কেন?

-দূর পাগলি...। এটা আর এমন কি? বলেছিলাম সারা জীবন সব কষ্ট ভাগাভাগী করে নেবো। ওইদিন যখন লিফট ছিঁড়ে দুর্ঘটনা হল, আমার পা ভাঙল অথচ তোমার পা এমন ভাবে আটকে ছিল যে পা কেটেই বাদ দিতে হল তোমায় বাঁচাতে! ডাক্তার থেকে পরে জানলাম যে তুমি প্রেগন্যান্ট ছিলে। আমি শুধু নিরবে সহ্য করেছিলাম সেদিন। আর তুমি জীবন্ত লাশের মত হয়ে গেছিলে।

-তাতে তোমার কি? তুমি তো ভাল হয়ে গেছিলে। কেন বদলাওনি নিজের ভাগ্য?

-ব্যস, এটাই চাইনি। চাইনি তোমায় ছেড়ে যেতে। তোমায় সাহস দিয়েছি, পাশে থেকেছি। কিন্তু তোমার ওইদিনের কথাগুলো খুব নাড়া দিল আমায়। আমি কতটা স্বার্থপর! দিব্যি ভালো মানুষের মত হেঁটে বেড়াচ্ছি অথচ আমার বউটা......। তাই রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। সব ভাগাভাগি করে নেয়ার কথা ছিল। তাই তোমার কষ্টও আমি ভাগ করে নেবো। ব্যস এই আর কি।

ভোরবেলার তূর্ণা এক্সপ্রেস যায় পাশের উপজেলা দিয়ে। গিয়ে পা বিছিয়ে দিলাম রেল লাইনে। হয়ে গেল, কাজ শেষ। তোমার মত আমার সাথীও এখন হুইল চেয়ার।

আরো জোরে কান্না করছে নীলা। রাহীর বুকে এলোমেলো কিল দিচ্ছে আর চিৎকার দিচ্ছে।

-তুমি পাগল, উন্মাদ, জানোয়ার। কেন এতো ভালবাসো আমায়?

-কারণ আমি তোমার মাঝেই আমার সব কিছু সাজিয়ে নিয়েছি। তুমি আছো তো, আমি আছি। তুমি নেই তো, আমিও নেই।

-তাই বলে এভাবে?

-তুমি জানো আমি এরকমই। এখন থেকে দুজনে সকালে হুইলচেয়ারে করে বাইরে ঘুরবো। এখনো আমি তোমার সাথেই নতুন করে সকাল দেখতে চাই। কিছু গল্প আসলেই আমাদের হয়। সত্যিই আমাদের হয়।

Story by Hasan Ibrahim.

Copying without permission is strictly prohibited. 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ